জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব হল বিশ্বব্যাপী সঞ্চিত বরফের গলন। হিমবাহ ও বরফস্তর বৃহৎ, ধীর-চলন্ত বরফের সমবায় যা পৃথিবীর স্থলভাগের ১০ শতাংশ অধিকার করে এবং যা অস্ট্রেলিয়া ব্যতীত প্রতি মহাদেশে উপস্থিত। এটি বিশ্বের বৃহত্তম মিষ্ট জলাধার, যা আংশিক ৭৫ শতাংশ (১)।.
গত শতাব্দীতে, পৃথিবীর বেশীরভাগ পর্বতের হিমবাহ এবং গ্রিনল্যাণ্ড ও অ্যান্টার্কটিকা উভয়ের বরফস্তর ভর হারিয়েছে। বরফের অপসরণ ঘটে যখন ভর ভারসাম্য (গ্রীষ্মকালে বরফের গলন আর শীতকালে বরফ সঞ্চয়ের মধ্যে পার্থক্য) ঋণাত্মক, অর্থাৎ যখন প্রত্যেক বছর প্রতিস্থাপনের চেয়ে বেশী বরফ গলে (২)। জলবায়ু পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত, যা হিমবাহের আয়তন প্রত্যর্পন সামর্থ্যের মূখ্য কারণ, প্রভাবিত করার দরুন হিমবাহ এবং বরফস্তরের ভারসাম্য প্রভাবিত করে। যখন তাপমাত্রা দীর্ঘ পর্যায়কালের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করে বা ঈষদুষ্ণ তাপমাত্রা অনেকদিন ধরে থাকে, এবং/ অথবা অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ঘটে, তখন হিমবাহ এবং বরফস্তর ভর হারায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার কিলিমান্জারতে বরফস্তরের পশ্চাতপসরনের উদাহরণ শ্রেষ্ঠ উদাহরন গুলির অন্যতম। এটা মহাদেশের উচ্চতম চূড়া এবং সুতরাং উষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়া সত্বেও এটা এতটাই উঁচু যে বহু শতাব্দী ধরে এখানে হিমবাহের বরফ বর্তমান। কিন্তু বিগত শতাব্দীতে মাউন্ট কিলিমানজারোর বরফের আয়তন প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে(৩)। যদি এই হারে বরফস্তরের ক্ষয় চলতে থাকে আগামী দশকে এর হিমবাহগুলি সম্ভবত অবলুপ্ত হয়ে যাবে(৪)। অনুরূপ হিমবাহের গলন আলাস্কা, হিমালয়, এবং অন্দিজেও ঘটছে।
Image from global-greenhouse-warming.com
হিমবাহের গলনের ব্যাপারে গবেষণা করার সময় বিজ্ঞানীদের কেবলমাত্র কতটা বরফ গলছে তা বিবেচনা করলেই চলবে না কত তাড়াতাড়ি গলছে সেটাও বিবেচ্য। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে উভয় বৃহৎ বরফস্তর মহাসমুদ্রের দিকে বরফের চলন উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যত গতি বাড়ে বরফের প্রবাহ আরও দ্রুত মহাসমুদ্রের দিকে যায়, এত দ্রুত যে তুষারপাতের মাধ্যমে চূড়ার বরফের পরিপূরণ সম্ভব হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে গ্রীনল্যান্ড বরফ স্তর থেকে নেমে আসা কিছু বরফ প্রবাহের চলনের গতি মাত্র কয়েক বছরে দ্বিগুন হয়েছে(৫)। কতখানি বরফের ক্ষয় হয়েছে তা নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে (যেমন আগে এবং পরে বরফস্তরের ছবি তুলে তা থেকে আকার ও আয়তনের পরিবর্তন অনুমান করা, বা উপগ্রহের মাধ্যমে বরফ স্তরের অভিকর্ষজ টান নির্ণয় করে তার ওজোন নির্ধারণ করা) বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে গ্রীনল্যান্ড বরফস্তরের ভরের ভারসাম্য বিগত কয়েক বছরে ঋণাত্মক হয়ে গিয়েছে। অনুমানিত যে প্রতি বছর বরফের সর্বমোট ক্ষয় ৮২ থেকে ২২৪ ঘন কিলোমিটারের মধ্যে(৫)।
Image from UNEP
আন্টার্কটিকায় সাম্প্রতিক অনুমানে দেখা যায় যে পূর্ব ও পশ্চিম আন্টার্কটিক বরফস্তরে ঘটা ঘটনা প্রবাহে তীব্র বৈসাদৃশ্য রয়েছে। পশ্চিম অতলান্তিকে বরফস্তরের ক্ষয়ের হারের ত্বরণ গত কয়েক বছরে গ্রীনল্যান্ডের মতো দ্বিগুন হয়েছে। পশ্চিম আন্টার্কটিকা ও গ্রীনল্যান্ডে এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ দ্রুততর গতিতে বরফনদীর মহাসমুদ্রের দিকে বয়ে যাওয়া। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন যে পশ্চিম আন্টার্কটিকায় প্রতি বছর ৪৭ থেকে ১৪৮ ঘন কিলোমিটার বরফ ক্ষয় হচ্ছে। অন্য দিকে, সাম্প্রতিক পরিমাপ নির্দেশ করে যে পূর্ব আন্টার্কটিকার বরফস্তর (যা পশ্চিম আন্টার্কটিকার থেকে বড়) অতিরিক্ত পতনের ফলে ওজনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এটা লক্ষনীয় যে পূর্ব আন্টার্কটিকার বরফস্তরের ওজোন বৃদ্ধি কোন ভাবেই পশ্চিম আন্টার্কটিকার বরফস্তরের সমান নয়(৫)। সুতরাং গোটা আন্টার্কটিকায় বরফস্তরের ভারসাম্য ঋণাত্বক।
প্রভাবসমূহ
হিমবাহ এবং বরফস্তরের গলনের দুটি প্রধান প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, হিমবাহর অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে যে সমস্ত অঞ্চল পর্বতের বরফগলা জলের উপর নির্ভরশীল সেগুলিতে খুব সম্ভবত ভীষণ জল ঘাটতি অনুভূত হবে। কম জলপ্রবাহ চাষের জল সরবরাহ কমিয়ে দেবে কারণ জলাধার গুলি এবং টাটকা জলের বান্ধ্গুলি আরও ঘন ঘন শুকিয়ে যাবে। জলের ঘাটতি বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে ব্যাপক আকার ধারণ করবে কারণ এই জায়গাগুলিতে যথাক্রমে আন্দিজ ও হিমালয়ের গ্রীষ্মকালীন জলপ্রবাহের ওপর জল সরবরাহের জন্য বিশেষভাবে নির্ভরশীল(৬)। উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু অংশেও হিমবাহের জলপ্রবাহ জলবিদ্যুত কেন্দ্র চালাতে, মত্স্যপালনে, কৃষিকাজে ও বড় শহরের জলের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা হয়। জলপ্রবাহের পরিমান কম হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে এই সব অঞ্চলের শক্তি, নাগরিক ও কৃষি পরিকাঠামো চাপের সম্মুখীন হতে পারে(৭)।
উপরন্তু হিমবাহ এবং বরফস্তরের গলন মহাসমুদ্রগুলির জল বৃদ্ধি করে যার ফলে সমুদ্রতলের উচ্চতাব্রিদ্ধি পায়, যে বিষয়ে পরবর্তী অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে।
পৃথিবীর তটভূমির শহরগুলির অধিকাংশই বিগত কয়েক সহস্রাব্দে গড়ে উঠেছে, সে সময় পৃথিবীর সমুদ্রতল প্রায় একই মাত্রায় স্থির ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে সমুদ্রতলের উচ্চতাবৃদ্ধি শুরু হয়েছে এবং সম্ভবত মনুষ্যজনিত জলবায়ু পরিবর্তনই এর প্রধান কারণ। বিংশ শতাব্দীতে সমুদ্রতলের উচ্চতা প্রায় ১৫ - ২০ মিলিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে (প্রতি বছর প্রায় ১.৫ থেকে ২ মিলিমিটার) এবং এই হার শতাব্দীর শেষের দিকে প্রথম দিক অপেক্ষা বেশী(৮.৯)। বিগত দশকে উপগ্রহ মারফত নেওয়া পরিমাপ থেকে প্রক্ষেপিত হয় যে এই বৃদ্ধির হার বেড়ে প্রতি বছর প্রায় ৩.১ মিলিমিটার দাঁড়িয়েছে, যা বিংশ শতাব্দীর গড়ের থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশী(১০)। প্রক্ষেপগুলি নির্দেশ করে যে সমুদ্রতল বৃদ্ধির হার সম্ভবত একবিংশ শতাব্দীতে বেড়ে যাবে, যদিও এই বৃদ্ধির সম্ভাব্য পরিমান সম্পর্কে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। পরবর্তী অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে এই মতানৈক্যের কারণ সমুদ্রতল বৃদ্ধির জন্য দায়ী যে তিনটি প্রধান কারণ: তাপজনিত প্রসারণ, হিমবাহ এবং বরফ আচ্ছাদনের গলন ও গ্রীনল্যান্ড এবং আন্টার্কটিকার বরফস্তরের বরফের ক্ষয়, সেগুলির অনিশ্চিত অবদান(১১)।

Image from NASA
সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী প্রধান রাশিগুলির বর্ণনা দেওয়ার আগে এটা বুঝতে হবে যে সমুদ্রস্থ বরফের গলন (যেমন মেরু অঞ্চলের এবং ভাসমান বরফস্তর) সরাসরি সমুদ্রতলের উচ্চতাবৃদ্ধি করবে না কারণ এই বরফ ইতিমধ্যেই মহাসমুদ্রে ভাসমান ছিল (সুতরাং পূর্বাহ্নেই এর ভোরের সমপরিমাণ জল অপসারিত করেছিল)। কিন্তু সমুদ্রতলের উচ্চতাবৃদ্ধিতে এই বরফের গলনের পরোক্ষ অবদান থাকতে পারে। যথা, সমুদ্রের বরফের গলনের ফলে 'আলবেডও' (তলের প্রতিফলন ক্ষমতা) হ্রাস পায় যার ফলে সূর্যের বিকিরণ অধিক শোষিত হয়। সৌরকিরণের অধিক শোষণ উষ্ণকরণ ত্বরান্বিত করবে এবং স্থলভূমিতে বরফ এবং তুষারের গলন বাড়িয়ে দেবে। উপরন্তু ভাসমান বরফস্তর ক্রমশ ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে স্থলভূমি থেকে মহাসমুদ্রে বরফের প্রবাহ দ্রুততর হবে এবং এইভাবে সমুদ্রতল বৃদ্ধির ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রভাব ফেলবে।
তিনটি প্রধান পদ্ধতিতে মনুষ্য জনিত জলবায়ু পরিবর্তন সমুদ্রতলের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রথমত বায়ু ও অন্যান্য তরল পদার্থের মত জলও তাপমাত্রা বাড়লে প্রসারিত হয় (তাপমান বাড়লে এর ঘনত্ব কমে যায়)। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মহাসমুদ্রের তাপমান বেড়ে যায়, প্রথমে উপরতলে পরে কয়েক শতাব্দী ধরে গভীরতায়ও, জল প্রসারিত হয় এবং এর ফলে তাপজনিত কারণে সমুদ্রতলের উচ্চতা বেড়ে যায়। তাপজনিত প্রসারণ সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ২.৫ মিলিমিটার সমুদ্রতল বৃদ্ধির জন্য দায়ী(১১)। এই কারণে বৃদ্ধির হার একবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে অন্তত তিনগুণ বেড়ে গেছে। যেহেতু এই কারণে সমুদ্রতলের উছতা বৃদ্ধি প্রধানত মহাসমুদ্রের তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল মহাসমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রক্ষেপ থেকে এর ভবিষ্যত বৃদ্ধির অনুমান করা যায়। একবিংশ শতাব্দী ধরে 'আইপিসিসি' র চতুর্থ নির্ধারণ প্রক্ষেপ করেছে যে তাপ জনিত প্রসারণের দরুন ১৭ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি হবে (৫০ শতাংশ বেশী বা কম)।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এই হারের রৈখিক অনুপাত থেকে মনে হয় এই অনুমান যা হওয়া উচিত তার থেকে কম; চলমান মহাসমুদ্রের উষ্ণকরনের সমস্ত আদর্শ নকশার প্রক্ষেপ নির্দেশ করে যে 'আইপিসিসি' র অনুমান খুবই কম হতে পারে। সমুদ্রতল বৃদ্ধির দ্বিতীয় এবং কম নিশ্চিত কারণ হিমবাহ এবং বরফ আস্তরণের গলন। 'আইপিসিসি' র চতুর্থ নির্ধারণ অনুমান করেছে যে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধে হিমবাহ এবং বরফ আস্তরণের গলন সমুদ্রতলের উচ্চতা ২.৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি করেছে। এটা গ্রীনল্যান্ড বা আন্টার্কটিকায় বরফ ক্ষয় জনিত উচ্চতাবৃদ্ধি, যা প্রায় এক সেন্টিমিটার, অপেক্ষা বেশী। 'আইপিসিসি' র চতুর্থ নির্ধারণের প্রক্ষেপ অনুযায়ী হিমবাহ এবং বরফ আস্তরণের গলন সমুদ্রতলের উচ্চতা প্রায় ১০-১২ সেন্টিমিটার বাড়াবে, যার অনিশ্চয়তা প্রায় এক তৃতীয়াংশ। এর অর্থ পর্বতের হিমবাহ ও ক্ষুদ্র বরফ আস্তরণের প্রায় এক তৃতীয়াংশের গলে যাওয়া।
তৃতীয় একটি পদ্ধতি যার দ্বারা সমুদ্রতল বৃদ্ধি ঘটতে পারে তা হল গীনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার বরফের ক্ষয়। যদি গ্রীনল্যান্ড এর সমস্ত বরফ গলে যায়, যা এমন একটা পদ্ধতি যা কয়েক শতাব্দী বা কয়েক সহস্রাব্দ নিতে পারে, তাহলে সমুদ্রতলের উচ্চতা ৭ মিটার বেড়ে যাবে। পশ্চিম আন্টার্কটিকার বরফস্তর প্রায় ৫ মিটার সমুদ্র তলের উচ্চতার সমপরিমাণ, এবং এই বরফ অধিকতর প্রবন কারণ এর অধিকাংশই সমুদ্রতলের মাত্রার নিচে ভূপাতিত। পূর্ব আন্টার্কটিকার বরফস্তর, যার গলনের প্রবণতা কম ৫৫ মিটার সমুদ্রতল বৃদ্ধির সমপরিমাণ জল ধারণ করে। বরফস্তরে সম্ভাব্য পরিবর্তন অনুমান করার জন্য ব্যবহৃত নকশাগুলি এখনও পর্যন্ত কেবলমাত্র উপরিতলের পদ্ধতিগুলি যেমন বাষ্পীভবন, উদ্বায়ুভবন, তুষারপাত দ্বারা বরফ তৈরির ফলে বরফের ভরের পরিবর্তন অনুমান করতে সক্ষম। একবিংশ শতাব্দীর অনুকরণ নকশাগুলির ফলাফল সারসংক্ষেপ করে 'আইপিসিসি' র কেন্দ্রীয় প্রতিবেদনে অনুমিত হয়েছে যে গ্রীনল্যান্ডের দরুন প্রায় ২ সেন্টিমিটার সমুদ্রতলের উচ্চতাবৃদ্ধি হবে যেখানে আন্টার্কটিকায় অধিকতর বরফ জমার ফলে প্রায় ২ সেন্টিমিটার সমুদ্রতলের উচ্চতাহ্রাস হবে। কিন্তু এই সব অনুমানের ব্যাপারে সমস্যা থাকার সম্ভবনা, যাই হোক সাম্প্রতিক উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের ফলে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে গ্রীনল্যান্ড এবং আন্টার্কটিকা উভয় স্থানেই বর্তমানে বরফের ভর হ্রাস পাচ্ছে, এবং আমরা এমন একটি শতকের প্রথম দশকে রয়েছি যা ক্রমশ উষ্ণতর হবে বলে প্রক্ষেপিত হয়েছে।
Image from wildwildweather.com
সমুদ্রতল বৃদ্ধির বিতর্ক
যেহেতু অনুকরণ নকশাগুলি বিংশ শতাব্দীতে লক্ষিত সমুদ্রতলবৃদ্ধির মাত্রা কম অনুমান করেছিল, একবিংশ শতাব্দীতে সমুদ্রতলবৃদ্ধির বৃদ্ধির বিষয়ে 'আইপিসিসি'র প্রক্ষেপ বিজ্ঞানী মহলে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক উত্থাপন করেছে। অনেক কারণে প্রক্ষেপগুলির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, বিশেষত বরফস্তরের অনুকরণ নকশাগুলির ঘাটতিগুলির বিষয়ে, যা উষ্ণীকরনের ফলে বরফস্তরের সরণের ব্যাখ্যা করে না (গতিবিদ্যা) যার মূল কারণ এর পদার্থবিদ্যা এখনও ভালোমত বোঝা যায় নি।
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বতাপমান কতটা এবং কত দ্রুত বাড়বে সেটা প্রক্ষেপ করার ব্যাপারেও সমস্যা রয়েছে, অংশত নির্গমনের সম্ভাব্য সীমার জন্য। যেহেতু বর্ধমান তাপমাত্রার সমুদ্রতলবৃদ্ধির জন্য দায়ী তিনটি কারণের সবগুলির পিছনেই প্রধান ভূমিকা রয়েছে, বিশ্ব উষ্ণীকরনের প্রক্ষেপের অনিশ্চয়তা সমুদ্রতলবৃদ্ধির প্রক্ষেপকেও অনিশ্চিত করে তোলে(৯)।
তাপজনিত প্রসারণের বিষয়ে বলতে হলে বলতে হয় যে মহাসমুদ্রগুলির শোষিত তাপের পরিমান নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। এই সমস্যা অংশত মহাসমুদ্রের তাপমান মাপার জন্য বিভিন্ন সময় ভিন্ন প্রকারের যন্ত্র ব্যবহারের ফল- পৃথক যন্ত্র ভিন্ন ফল সৃষ্টি করে। বর্তমানে বিংশ শতাব্দীতে মহাসমুদ্রগুলির শোষিত তাপ ও সমুদ্রতলের উচ্চতাবৃদ্ধির অনুকরনগুলি পুরোপুরি মেলে না। যার ফলে একবিংশ শতাব্দীতে প্রত্যাশিত তাপজনিত প্রসারণের মাত্রা অনুমান করা কঠিন।
দ্বিতীয়ত, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ব্যাপারে অনিশ্চয়তা পর্বতের হিমবাহ এবং বরফ আস্তরণের গলনের হার সম্পর্কে প্রক্ষেপের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে। হিমবাহগুলির পশ্চাতপসরন সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রেই এর গতি অনুকরণ নকশা অপেক্ষা দ্রুততর। এটা নকশার ঘাটতির ফল না কালী জমার কারণে গলনের হার বৃদ্ধির ফল বা উভয় কারণেই, বা অন্য সম্ভাব্য কারণে তা এখনও পরিষ্কার নয়।
তৃতীয় এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি গ্রীনল্যান্ড ও পশ্চিম আন্টার্কটিকার বরফস্তরে সম্ভাব্য ক্ষয়ের হার সম্পর্কিত। বরফস্তরের চলনের গতিবিদ্যা এখনো ভালো করে বোঝা যায় নি – কিছু বরফ নদী অতি দ্রুত ধাবমান সমুদ্রতল বৃদ্ধিতে যার অবদান বছরে ১০ মিলিমিটার বা আরও বেশী। এই হার অন্য সব হারের চেয়ে অনেক বেশী। এক বা উভয় বরফস্তর ভেঙ্গে পরার সম্ভবনা আছে বলে মনে হয়, বিশেষত যদি বরফ নদীর প্রবাহ রোধকারী ভর দেওয়া বরফস্তরের দ্রুত ক্ষয় হয়। এই সমস্ত পদ্ধতিকে সঠিকভাবে জলবায়ু নকশায় ধরা অত্যন্ত কঠিন, আবার এই সব পদ্ধতিগুলি, যা সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, ভ্রান্তি ছাড়া কিছু নয়। ফলস্বরূপ 'প্রক্ষেপিত' একবিংশ শতাব্দী ও তার পরের সমুদ্রতল বৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্য ভাবে কম হতে পারে।
সমুদ্রতলবৃদ্ধির প্রভাব সমূহ
যদিও অবিসংবাদি ভাবে প্রক্ষেপিত ভবিষ্যত সমুদ্রতল বৃদ্ধির মোকাবিলায় বহু কিছু করার আছে, আপাতদৃষ্টিতে অতি ক্ষুদ্র সমুদ্রতলের উচ্চতাবৃদ্ধিও তট ভূমির পরিবেশের ওপর অতি নাটকীয় প্রভাব ফেলতে পারে। তটভূমি অঞ্চলে ৬০ কোটি মানুষ বাস করে আর সে সব অঞ্চল সমুদ্রতল থেকে ১০ মিটারের কম উঁচু।পঞ্চাশ লক্ষর বেশী জনসংখ্যা বহুল পৃথিবীর শহরগুলির দুই তৃতীয়াংশ এই সব ঝুঁকিপ্রবন অঞ্চলে অবস্থিত (১২)। যদি সমুদ্রতল প্রক্ষেপ অনুযায়ী কয়েক শতাব্দী ধরে ত্বরান্বিত হারে বাড়তে থাকে তাহলে এই সব ঝুঁকিপ্রবন অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক জনগণ পুনর্বাসন খুঁজতে বাধ্য হবে।যদি পুনর্বাসনে বিলম্ব হয় বা যদি ঝড়ে ও জলোচ্ছ্বাসে এই অঞ্চল জলমগ্ন হবার সময় ও জনগণ এই অঞ্চল ছেড়ে না যায় তবে বিপুল সংখ্যক পরিবেশগত উদ্বাস্তুর সৃষ্টি হবে।
আই পি সি সি র মোট অনুসারে সর্বোত্তম পরিস্থিতিতেও তট ভূমির পরিবেশ ও পরিকাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান সমুদ্রতলের বহু প্রসারী প্রভাব পড়বে। প্রভাব্গুলির মধ্যে আছে তট ভূমির ক্ষয়, মত্স্য পাখি অন্য বন্যা প্রাণী ও বৃক্ষের বিচরনভূমি হ্রাস (১১)। পরিবেশ রক্ষা সমিতির মোট অনুসারে 0.৬৬ মিটার সমুদ্রতল বৃদ্ধি ঘটলে ২৬০০০ বর্গ কিলোমিটার স্থলভূমি লুপ্ত হয়ে যাবে। আবার আই পি সি সি র মোট এ বতমান হারে সমুদ্রতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ৩৩ শতাংশ তট ভূমি ও জলাভূমি সংলগ্ন বিচরণ ভূমি আগামী ১০০ বছরে লুপ্ত হয়ে যাবে। এমনকি যদি বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশী হয় তবে আরও বেশী ভূমিক্ষয় হবে এবং তা খুবই সম্ভব (১১)। এর ফলে বিপুল সংখ্যক জলাভূমিও সন্ত্সান্তে জায়গায় বসবাসকারী প্রজাতি সম্ভবত গুরুতর ঝুঁকি র মধ্যে রয়েছে। উপরন্তু যে সমস্ত প্রজাতি সমুদ্রের বরফের ওপর তাদের অস্তিত্বের জন্য নির্ভরশীল বরফস্তরের পাস্চাতপসরণ ত্বরান্বিত হলে তারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হবে, মেরু অঞ্চলের ভালুক শীল এবং কিছু প্রজাতির পেঙ্গুইন অবলুপ্তির সম্মুখীন (১৩)।
দুর্ভাগ্যবশত বহুসংখ্যক দেশেরই, যারা সমুদ্রতল বৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি প্রবন, এর বিরুদ্ধে প্রস্তুতির জন্য সংস্থান নেই। বিশেষ করে উন্নতিশীল দেশগুলির, যেমন বাংলাদেশ ভিয়েতনাম ভারত চীন, নিচু তট ভূমি অঞ্চলে, যার মধ্যে রয়েছে ঝুঁকি প্রবন অঞ্চল যেমন ব দ্বীপ -যেখানে নদী সমুদ্রের সঙ্গে মেশে, বিপুল সংখ্যক জনগণ বাস করে। বৃহৎ দ্বীপে বসবাসকারী জাতি সমূহ যেমন ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়া এবং ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলি যথা টুভালু ও ভানুয়াতু উভয়েই ভসনভাবে ঝুঁকি গ্রস্ত কারণ এদের কারোরই অপসারিত তট ভূমির জনগনকে পুনর্বাসিত করার মত যথেষ্ট পরিমান উঁচু স্থলভূমি নেই। কিছু সংখ্যক দ্বীপ দেশের আরেকটি বিপদের সম্ভবনা, সমুদ্রতল বৃদ্ধির জন্য জলাশয়ে নোনা জল ঢুকে তাদের পরিশ্রুত জলের সরবরাহ নষ্ট হতে পারে। এই সমস্ত কারণে যাঁরা অনেকগুলি ক্ষুদ্র দ্বীপ সমাহৃত দেশে বাস করছেন, যেমন ভারত মহাসাগরে মালদ্বীপ বা প্রশান্ত মহাসাগরে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, তাঁরা একবিংশ শতাব্দীতে বাসস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হতে পারেন (১১)।
Image from globalwarmingart.com
প্রতি বছর মহাসমুদ্রগুলি মানুষের ত্যাগ করা কার্বন ডাই অক্সাইডের প্রায় এক ত্রিতিয়ান্গ্সর সমপরিমাণ শোষণ করে আর তা গভীর সমুদ্রে স্থানান্তরিত করে দেয় (১৩)। বিগত ২০০ বছর ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে ক্রমবর্ধমান হারে কার্বন ডাই অক্সাইড্ নির্গমন মহাসমুদ্রে দ্রবীভূত কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান উল্লেখ যোগ্য ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্রবীভূত কার্বন ডাই অক্সাইড্ কার্বনিক অসিদ উত্পন্ন করে যা মহাসমুদ্রের ফ এর মাত্রা কমিয়ে সমুদ্রের অম্লতা আরও বাড়িয়ে দেয় (১৫)।
অম্লতা ফ এর মাপকাঠি ব্যবহার করে মাপা হয়, এই মাপকাঠিতে যে কোন পদার্থের ০ থেকে ১৪র মধ্যবর্তী কোন মান থাকবে। ৭ এর মান নিরপেক্ষ, উচ্চতর মান ক্ষারীয় বলে ব্যাক্ষিত হয় আর নিম্নতর মান আমল। ঐতিহাসিক ভাবে মহাসমুদ্রের ফ ছিল ৮.১৭ যার অর্থ মহাসমুদ্রের জল মৃদু ক্ষারীয়।কিন্তু ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্বের জন্য অম্লিকরণের ফলে বর্তমানে মহাসমুদ্রের pH এর মান ৮.০৭, যার অর্থ ক্রমশ সমুদ্রের জলের pH নিরপেক্ষতার দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে।
ভুতত্বাগত প্রমান এবং নকশা পুনর্গঠনের দ্বারা সূচিত হয় যে বিগত ৩০ কোটি বছর যাবত মহাসমুদ্রের গড় pH বর্তমান pH এর থেকে ০.৬ ডিগ্রির বেশী হেরফের হয় নি (১৪)। এই ভাবে মহাসমুদ্রের বর্তমান পরিবেশব্যবস্থা একটি স্থায় pH এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিগত ২০০ বছর ধরে ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই অক্সাইড্ মাত্রার সঙ্গে সমুদ্রের pH নিশ্চিতভাবে কমছে। যদিও মেরুয়ান্চল ছাড়া মহাসমুদ্রের অম্লীকরণ নিজে এমন কিছু ভয়ের কারণ নয়, যেই হারে সমুদ্রের pH কমছে তা খুবই আশঙ্কার কারণ। এর কারণ যে সমস্ত প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ব্যবস্থাগুলি এতদিন pH এর স্থিতাবস্তা বজায় রেখেছিল পরিবর্তনের হার তার থেকে অনেক বেশী। যদি কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বাড়তেই থাকে আর সমুদ্রের pH বর্তমান হারে কমতেই থাকে তবে দ্বাবিংশ শতাব্দীতে মহাসমুদ্রের pH 0.5 এর মত কমতে পারে (১৪)। এই রকম দ্রুত পরিবর্তন খুব সম্ভবত সামুদ্রিক জীবদের ওপর প্রভূত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
সম্ভাব্য প্রভাবগুলি / নিরোধক ব্যবস্থাগুলি
সমুদ্রের অম্লীকরণ সর্বাপেক্ষা সরাসরি প্রভাব পড়বে সামুদ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থায়। মহাসমুদ্রের pH হ্রাস জলে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের (জলে কার্বন ডাই অক্সাইড্ দ্রবীভূত হওয়ার সময় প্রাথমিক ভাবে পদার্থটি উত্পন্ন হয়) মাত্রা কমিয়ে দিয়ে সামুদ্রিক জীবদের প্রভাবিত করবে। বহু সামুদ্রিক জীব (যথা কোরাল, শেল্ল্ফিশ, ক্রাস্তাসিয়া ও মলাস্ক গোত্রীয় প্রাণী) তাদের খোলস তৈরির জন্য ক্যালসিয়াম কার্বনেট ব্যবহার করে (১৭)। যদি সমুদ্রের pH আশংকা অনুযায়ী এই শতাব্দীতে ০.৫ হ্রাস পায় তার ফলে উপলব্ধ কালসিয়াম কার্বনেট ৬০ শতাংশ হ্রাস পাবে (১৭)। এই প্রকার হ্রাস হাজার হাজার সামুদ্রিক প্রজাতির উত্পাদন ও অস্তিত্ব সংকটজনক করে তুলবে।
মহাসমুদ্রের দ্রুত অম্লীকরণ রোধ করতে এবং সমুদ্রের pH কে সামুদ্রিক জীবদের গ্রহণযোগ্য মাত্রার মধ্যে রাখতে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব অনধিক ৪৫০ পি.পি.এম. (প্রতি নিযুতে ৪৫০ অংশ) রাখতে হবে। বর্তমান ঘনত্ব প্রায় ৩৮৭ পি.পি.এম কিন্তু নির্গমনের মাত্রা দ্রুত না কমালে এই শতকের মাঝামাঝি তা সম্ভবত ৫০০ পি.পি.এমের কাছে গিয়ে পৌঁছাবে। pH এর হ্রাস কে ০.২ এর মধ্যে বেঁধে রাখতে যাতে সংবেদনশীল সামুদ্রিক পরিবেশ্চক্র রক্ষা পায় কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব প্রায় ৪৫০ পি.পি. এমের নিচে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে (১৮)।
হিমবাহের পস্চাতপসরনের আরেকটি ফল সদ্য গলা জলের থার্মো হ্যালাইন সঞ্চালনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। মহাসমুদ্রের জলের ঘনত্ব দ্বারা তাড়িত হয়ে থার্মো হ্যালাইন (বা গভীর সমুদ্রের ওঠাল পাথাল) সঞ্চালন সামুদ্রিক স্রোতের বিশ্ব প্রবাহ দ্বারা সৃষ্টি হয়। মহাসমুদ্রের জলের চতুর্দিকে ঘোরাফেরার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জলীয় ভোরের সৃষ্টি হয়, কারণ বাষ্পী ভবন পরিষ্কার জল কমিয়ে দেয় আর বৃষ্টিপাত ও নদীপ্রবাহ তা বাড়ায়, এরা প্রত্যেকেই সমুদ্রের নানাভাব পরিবর্তনের মাধ্যমে তার ঘনত্বকে প্রভাবিত করে। উপরিতলের স্রোত্গুলি যা প্রধানত বায়ুর গতিনক্ষার ওপর নির্ভরশীল জলকে এমন সমস্ত স্থানে নিয়ে যায় যেখানে উচ্ছ সূর্য্য তাপে তা গরম হয় (ফলে ঘনত্ব হ্রাস পায়) বা উচ্চ অখ্যাংশে তা ঠান্ডা হয় (ফলে ঘনত্ব বেড়ে যায়)যখন জলের উপরিতলের ঘনত্ব নিচের থেকে বেড়ে যায় তখন নিম্নমুখী স্রোত ঘনতর উপরের জলকে নিচের দিকে তাড়িত করে কম ঘন পুষ্টিদায়ী জলকে উপরদিকে ঠেলে দেয় যেখানে বায়ু তাদের চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয় ও সামদ্রিক জিবে পরিপূর্ণ অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। এইভাবে কোথায় সমুদ্রের জল সরবে ও কোথায় সামুদ্রিক প্রাণীর সহায়ক উল্লেখযোগ্য পুষ্টিকারক থাকবে তার স্থিরতার পক্ষে তাপমাত্রা দ্বারা সৃষ্ট ঘনত্বের ফারাক (ঠান্ডা জল গরম জল অপেক্ষা বেশী ঘন) এবং নানাভাব ( নোনাজল মিস্তজল অপেক্ষা বেশী ঘন) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (19)। যেহেতু তাপমাত্রা ও নানাভাব উভয়েই জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল কিভাবে থার্মো হ্যালাইন সঞ্চালন প্রভাবিত হতে পারে সে বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রভাবগুলি বিভিন্ন উপায়ে কাজ করতে পারে। প্রথমত মহাসমুদ্রের সঞ্চালন হিমবাহ কিম্বা বরফস্তরের প্রবাহ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যখন হিমবাহ গলে পরিষ্কার জল মুক্ত হয়ে সমুদ্রে যায়, এই যুক্ত জল নোনাজলের ঘনত্ব হ্রাস করে, এইভাবে নিচের স্তরে জলপ্রবাহ কমিয়ে দেয় কারণ অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার জল ডুবতে পারে না (এমনকি উচ্চতর অক্ষন্গ্শেও যেখানে এটা আরও ঠান্ডা এবং ঘন)। এই ভাবে গভীর সমুদ্রের স্রোত প্রভাবিত হয় (২০)। যে গতিতে হিমবাহগুলি গলছে এবং যে পরিমান পরিষ্কার জল সমুদ্রে যুক্ত হচ্ছে তাতে এটা খুবই সম্ভব যে থার্মো হ্যালাইন সঞ্চালনের তীব্রতা কমে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন কেবলমাত্র সমুদ্রের নানাভাবকে প্রভাবিত করবে না মহাসমুদ্রের তাপমাত্রা ও সঞ্চলন ধরণকেও প্রভাবিত করবে। প্রথমত যখন সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ে তখন তাপজনিত প্রসারণের জন্য মহাসমুদ্রের জলের ঘনত্ব কমে যায় আর তার আয়তন বেড়ে যায় ফলে সমুদ্রতলের মাত্রা বাড়ে। উপরিতলের স্রোত্গুলি যা প্রধানত বায়ুর গতিনক্ষার ওপর নির্ভরশীল জলকে এমন সমস্ত স্থানে নিয়ে যায় যেখানে উচ্ছ সূর্য্য তাপে তা গরম হয় (ফলে ঘনত্ব হ্রাস পায়) বা উচ্চ অখ্যাংশে তা ঠান্ডা হয় (ফলে ঘনত্ব বেড়ে যায়)যখন জলের উপরিতলের ঘনত্ব নিচের থেকে বেড়ে যায় তখন নিম্নমুখী স্রোত ঘনতর উপরের জলকে নিচের দিকে তাড়িত করে আরে বং কম ঘন পুষ্টিদায়ী জলকে উপরদিকে ঠেলে দেয় যেখানে বায়ু তাদের চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয় ও সামদ্রিক জিবে পরিপূর্ণ অঞ্চলের সৃষ্টই হয়(১৯)। সমুদ্রের উপরিতলের জল গরম হয়ে যখন দেবার সম্ভবনা কমে যায় কম পরিমানে ঠান্ডা জল উপরে উঠে আসে যার ফলে মহাসমুদ্রের সঞ্চালনের ধরনও প্রাণীজগত প্রভাবিত হয়। উপরন্তু উচ্চতর তাপমাত্রা বাষ্পী ভবন আরও বাড়িয়ে দেবে। জল বাষ্প হয়ে উড়ে গেলে নুন পিছনে পরে থাকে। নোনাভাবের বৃদ্ধি জলের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয় সুতরাং সঞ্চালনের নকশাকে প্রভাবিত করে (২১)।
এই সমস্ত পদ্ধতিগুলির অন্তর্দ্বন্দ থেকে উদ্বেগ ক্রমবর্ধমান যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে থার্মো হ্যালাইন (গভীর মহাসমুদ্রের) সঞ্চালনের তীব্রতা সর্বপরি কমে যাবে। যদি পরিষ্কার জলের পরিমান বা সমুদ্রের বর্ধমান তাপমাত্রা দ্রুত জলের ঘনত্বকে পরিবর্তিত করে থার্মো হ্যালাইন সঞ্চালনের পথ পাল্টে যেতে পারে বা উল্লেখযোগ্য ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী মহাসমুদ্রের তাপমাত্রার নকশায় যেহেতু এই সঞ্চালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, তাই আবহাওয়ার নকশাও বিপর্যস্ত হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।
Image from UCAR
এই ধরনের পরিবর্তনগুলি উত্তর ইউরোপের দেশগুলির পক্ষে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গাল্ফ প্রণালী উষ্ণ অঞ্চল থেকে উষ্ণ জল উত্তর অতলান্তিকে বহন করে এবং এর স্থানান্তরিত করা তাপের দরুন এই অঞ্চলের তাপমাত্রা মৃদু হয় যদিও ইউরোপ তুলনামূলকভাবে অক্ষাংশের পূর্বের দিকে অবস্থিত। যথেষ্ট ঠান্ডা হাওয়ার পর জল গ্রিনল্যান্ডও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে ও আরও উত্তরে নিচে চলে যায় যার ফলে উষ্ণ অঞ্চল থেকে আরও জল উত্তর দিকে চলে আসে। যদি সমুদ্রের উষ্ণতাবৃদ্ধি থার্মো হ্যালাইন সঞ্চালন ধীরে করে দেয় উত্তর ইউরোপে কম জল বাহিত হবে; এই সব অঞ্চল উষ্ণতা কম অনুভূত হবে বা এমনকি ঠান্ডাও হতে পারে (২১)।
এই ধরনের ঠান্ডা করার মত ঘটনা অনেক আগে প্রায় ১২০০০ বছর আগে ঘটেছিল যখন উত্তর আমেরিকার হিমবাহ থেকে বরফ গলা জল উত্তর অতলান্তিকের জলকে টাটকা করেছিল যার ফলে সম্ভবত থার্মো হ্যালাইন সঞ্চালন বন্ধ হযে গিয়েছিল (২২) এবং আবহাওয়া ও মহাসমুদ্রের সঞ্চালন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল (২৩) থার্মো হ্যালাইন সঞ্চালন বন্ধ হওয়ার এক দশকের মধ্যে বিশ্ব জলবায়ু নকশা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার তাপমান ১৫ ডিগ্রী সেন্তিগ্রেদের মতন কমে গিয়েছিল। জলবায়ুর এইরকম দ্রুত ও নাটকীয় পরিবর্তন ইতিপূর্বে ঘটেনি কিন্তু গ্রিনল্যান্ডে বরফ গলা শুরু হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে অনুরূপ হটাৎ পরিবর্তন হবার ঝুঁকি ক্রমবর্ধমান (২৪)।
উপসংহার
যদি কার্বন ডাই অক্সাইড্ নির্গমন ও জলবায়ু পরিবর্তন চলতেই থাকে মহাসমুদ্রের স্ব্যাস্থের ঝুঁকি একটি চিন্তার বিষয় হয়ে থাকবে। হিমবাহ ও বরফস্তরের ক্রমবর্ধমান হারে গলনের ফলে সমুদ্রতল বৃদ্ধি, মহাসমুদ্রগুলির অম্লতা হ্রাস, ও থার্মো হ্যালাইন সন্চোলন কমে গেলে বিভিন্ন উপায়ে মহাসমুদ্রের গতিবিদ্যা ও পরিবেশ্চক্রের সুক্ষ ভারসাম্যে ঝুঁকি এসে যাবে। এই রস্মিগুলি এবং এর সাথে কিভাবে এর প্রভাবগুলি বিক্রিয়া করবে তার অনুমানের অনিস্চাযতা মহাসমুদ্রের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে: যা ভবিষ্যত প্রজন্মের পক্ষে ক্রমবর্ধমান সমস্যার বিষয়।
Figure 1: Causes of sea level rise from climate change. (2002). In UNEP/GRID-Arendal Maps and Graphics Library. Retrieved 17:10, March 26, 2008 from http://maps.grida.no/go/graphic/causes-of-sea-level-rise-from-climate-change.
Translated by Saheli Nath
Nicholls, R.J., P.P. Wong, V.R. Burkett, J.O. Codignotto, J.E. Hay, R.F. McLean, S. Ragoonaden and C.D. Woodroffe, 2007: Coastal systems and low-lying areas. Climate Change 2007: Impacts, Adaptation and Vulnerability. Contribution of Working Group II to the Fourth Assessment Report of the Intergovernmental Panel on Climate Change, M.L. Parry, O.F. Canziani, J.P. Palutikof, P.J. van der Linden and C.E. Hanson, Eds., Cambridge University Press, Cambridge, UK, 315-356. http://www.ipcc-wg2.org/index.html
EPA. “Coastal Zones and Sea Level Rise.” Updated 08 February 2008
Union of Concerned Scientists. "Highlights from the First Section of the IPCC Fourth Assessment Report."
Interactive sea level map: http://flood.firetree.net/
CMAR. Sea Level Rise: Understanding the past -- Improving projections for the future
The High Stakes for Small Islands (Autumn 2009 Climate Alert)
Polar Ice Melting Spurs Interest in Climate Stabilization
Sea Level Rise and Severe Storms in the Chesapeake Bay Region: A Canary in the Mineshaft?
America’s Coast Under Global Warming Threat
|
Join the Climate Institute e-news mailing list: |
© 2007 - 2010 Climate Institute All Rights Reserved |
900 17th St. NW, Suite 700, Washington, DC 20006 Phone: +1-202-552-4723 Fax: +1-202-737-6410 info@climate.org |